পাসপোর্ট রিনিউ করার নিয়ম
পাসপোর্ট রিনিউ করার নিয়ম আমাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা জানেন না। তাই প্রায়ই অনলাইনে তারা এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করে থাকেন। যাদের হাতে ই-পাসপোর্ট বা এমআরপি পাসপোর্ট রয়েছেও পাসপোর্টের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে অথবা খুব শীঘ্রই মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে, তাদের অবশ্যই পাসপোর্ট রিনিউ করার নিয়ম জানতে হবে। এই নিয়ম অনুসারে পাসপোর্ট নবায়ন করতে হবে।
বর্তমানে পূর্বের মতো অফলাইনে পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করা যায় না। এখন শুধুমাত্র অনলাইনে আবেদন করার মাধ্যমেই আপনার পাসপোর্টটি নবায়ন করতে পারবেন। আপনি যদি বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করেন, তাহলে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট রিনিউ করতে পারবেন। আর বাংলাদেশে থাকলে আপনার আঞ্চলিক বা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস থেকে অনলাইনে আবেদন করে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে।
যেহেতু বৈধ পাসপোর্ট আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য বেশ দরকারি। তাই পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে আপনাকে অবশ্যই এটি রিনিউ করতে হবে। এই আর্টিকেলে, আমরা ই-পাসপোর্ট রিনিউ করার নিয়ম ২০২৬ ও পাসপোর্ট রিনিউ করতে কি কি লাগে সে সম্পর্কে ধাপে ধাপে আলোচনা করব।
পাসপোর্ট রিনিউ কেন করবেন
আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বা মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট দিয়ে আপনি কোন দেশে ভ্রমণ করতে পারবেন না। পাসপোর্ট আপনার পরিচয় ও নাগরিকত্ব প্রমাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হওয়ায় মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই বা পরে অবশ্যই পাসপোর্টটি রিনিউ করে নিতে হবে। এছাড়াও অনেক দেশে ভ্রমণের জন্য বৈধ পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ৬ মাস থাকা বাধ্যতামূলক।
পাসপোর্ট রিনিউ করার পূর্বে করণীয়
পার্সপোর্ট রিনিউ করার পূর্বে অবশ্যই বেশ কিছু কাজ করনীয় রয়েছে। যেমন:
- সঠিক অফিস চিহ্নিতকরণ: আপনি যেই আঞ্চলিক বা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছিলেন অবশ্যই রিনিউ করার সময় কাগজপত্র জমা দিতে হবে সেই একই অফিসে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি প্রথমবার পিরোজপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট নিয়ে থাকেন। তবে পাসপোর্ট রিনিউ করার জন্যও আপনাকে পিরোজপুর আঞ্চলিক পার্সপোর্ট অফিসেই আবেদন করতে হবে।
- ডকুমেন্ট প্রস্তুতি: আবেদনের আগেই পাসপোর্ট রিনিউ করতে কি কি লাগে তা জেনে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সংগ্রহ করে রাখুন।
- ফি সম্পর্কে জানুন: পাসপোর্ট রিনিউ ফি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিন ও কীভাবে এটি পরিশোধ করতে হয় তা বুঝে নিন।
- অনলাইন অ্যাকাউন্ট তৈরি: রিনিউ করার জন্য epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। পূর্বে অ্যাকাউন্ট থাকলে লগইন করুন।অ্যাকাউন্ট না থাকলে নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।
পাসপোর্ট রিনিউ করার নিয়ম (ধাপে ধাপে)
পাসপোর্ট নবায়ন বা রিনিউ করার জন্য ই-পাসপোর্ট ওয়েবসাইট www.epassport.gov.bd এ গিয়ে একটি নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হবে। আবেদন করার সময় আপনাকে উল্লেখ করতে হবে যে আপনার কাছে ইতিমধ্যে একটি মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) বা ই-পাসপোর্ট রয়েছে এবং তার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। এরপরের একটি নতুন পাসপোর্টের আবেদনের মতোই সম্পন্ন করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- বর্তমানে বাংলাদেশের সব জেলায় পাসপোর্ট আবেদন, সংশোধন ও রিনিউয়ের সুবিধা চালু আছে।
- যদি আপনার কাছে পুরোনো এমআরপি পাসপোর্ট থেকে থাকে। তাহলে সেটি নবায়নের সাথে সাথে ই-পাসপোর্ট এ পরিণত হবে। নতুন করে এমআরপি পাসপোর্ট দেওয়া হয় না।
- অনলাইনে নিজেই পাসপোর্ট রিনিউ ফর্ম পূরণ করতে পারবেন। খেয়াল রাখবেন আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের সকল তথ্য যেন পাসপোর্টের তথ্যের সাথে হুবহু মিলে যায়।
- রিনিউ আবেদনে পূর্ববর্তী পাসপোর্ট নম্বর দিলেই আপনার ব্যক্তিগত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসবে।
- যদি কোন তথ্য সংশোধন করতে হয়, তবে সেক্ষেত্রে পাসপোর্ট সংশোধনের জন্য আলাদাভাবে আবেদন করতে হবে।
নতুন হালনাগাদ: নতুন পাসপোর্টে Personal Data and Emergency Contact Page-এ Spouse Name-এর পরিবর্তে Legal Guardian’s Name অপশন থাকবে। এছাড়াও নতুন পাসপোর্টে কোন QR কোড থাকবে না।
প্রবাসীদের পাসপোর্ট রিনিউ পদ্ধতি
বাংলাদেশি হয়েও যারা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন তাদের পার্সপোর্ট নবায়ন অর্থাৎ রিনিউ করার জন্য বেশ কিছু ধাপ অনুসরণ করতে হবে। যেমন:
- আপনি যে দেশে অবস্থান করছেন সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস বা মিশনে যোগাযোগ করুন।
- দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী অনলাইনে আবেদন করুন।
- প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: (ক) পুরোনো পাসপোর্ট (আসল ও ফটোকপি), (খ) বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র বা অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদের কপি (প্রিন্ট আউট), (গ) আবেদন ফর্মের প্রিন্ট কপি, (ঘ) ফি পরিশোধের রসিদ।
- তথ্য পরিবর্তন: পূর্ববর্তী পাসপোর্টের কোন তথ্য পরিবর্তন করতে চাইলে তার জন্য অতিরিক্ত দলিলের প্রয়োজন হতে পারে। দূতাবাস আপনাকে তা জানিয়ে দেবে।
- গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: বিদেশে আপনার আকামা বা রেসিডেন্স পারমিট পাসপোর্টের তথ্যানুযায়ী হয়ে থাকে। পাসপোর্টে তথ্য পরিবর্তন হলে অবশ্যই সেটিও সংশোধন করে নেবেন।
- ফি পরিশোধ: প্রবাস থেকে সাধারণত মানি অর্ডার, ক্যাশিয়ার্স চেক বা অফিশিয়াল চেকের মাধ্যমে পাসপোর্ট রিনিউ ফি পরিশোধ করতে হয়।
অনলাইন আবেদনে সতর্কতা: আবেদন ফর্মের প্রথমেই জিজ্ঞাসা করা হবে “Are You Applying from Bangladesh?”। আপনি প্রবাসী বলে “NO” সিলেক্ট করে আপনার বর্তমান দেশের নাম চয়ন করবেন।
অনলাইনে পাসপোর্ট রিনিউ আবেদন করার নিয়ম
অনলাইনে পাসপোর্ট রিনিউ করার জন্য আপনাকে বেশ কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। এডকল ধাপ নিম্নরূপ:
- ওয়েবসাইট: www.epassport.gov.bd তে যান।
- অ্যাকাউন্ট: লগইন করুন বা নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।
- আবেদন শুরু: “Apply for New Passport” লিংকে ক্লিক করুন।
- প্রাথমিক তথ্য: Passport Type, ব্যক্তিগত তথ্য (Personal Details) এবং ঠিকানা (Address) দিন।
- গুরুত্বপূর্ণ ধাপ – ID Documents: এই ধাপে আপনাকে বলতে হবে যে আপনার পূর্ববর্তী পাসপোর্ট আছে।
- যদি এমআরপি পাসপোর্ট থেকে থাকে: “Yes, I have a machine readable passport (MRP)” সিলেক্ট করুন।
- যদি ই-পাসপোর্ট থেকে থাকে: “Yes, I have Electronic Passport (ePP)” সিলেক্ট করুন।
- কারণ উল্লেখ: “What is the reason for your passport request?” – এখানে কারণ বাছাই করুন।
- মেয়াদ শেষ হলে: “EXPIRED” সিলেক্ট করুন।
- এমআরপি থেকে ই-পাসপোর্ট নবায়ন: “CONVERSION TO E-PASSPORT”।
- অন্যান্য কারণ: LOST/STOLEN, DATA CHANGE, UNUSABLE, OTHER ইত্যাদি।
- পুরোনো পাসপোর্টের তথ্য: আপনার পুরোনো পাসপোর্ট নম্বর, ইস্যুর তারিখ এবং মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ দিন।
- পরবর্তী ধাপসমূহ: একটি নতুন পাসপোর্টের আবেদনের মতোই পৃষ্ঠাসংখ্যা, মেয়াদ ইত্যাদি নির্বাচন করে আবেদন সম্পন্ন করুন।
- আবেদন আইডি: আবেদন শেষে আবেদন আইডি নম্বর (Application ID) সংগ্রহ করে রাখুন এবং আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি নিন।
- কাগজপত্র জমা: প্রিন্টকৃত আবেদনপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দলিলাদি আপনার নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিসে জমা দিন।
আরও জানতে পারেনঃ পাসপোর্ট সংশোধন করার নিয়ম
পাসপোর্ট রিনিউ করতে কি কি লাগে?
পাসপোর্ট রিনিউ করতে বেশ কিছু কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়ে থাকে। এসকল কাগজপত্রের মধ্য রয়েছে:
- অনলাইন আবেদনপত্রের প্রিন্টকপি (নিবন্ধন পৃষ্ঠাসহ)।
- পাসপোর্ট ফি পরিশোধের আসল রসিদ (ব্যাংক চালান/ড্রাফট)।
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা স্মার্ট কার্ড / অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদের ফটোকপি।
- পুরোনো পাসপোর্টের মূল কপি ও ফটোকপি।
- সরকারি চাকুরিজীবীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তর জিও/এনওসি (No Objection Certificate)।
- প্রয়োজন অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন ফর্ম।
পাসপোর্ট রিনিউ করতে কত টাকা লাগে?
পার্সপোর্ট রিনিউ অর্থাৎ আপনি নতুন পার্সপোর্ট হাতে পাবেন। নতুন পাসপোর্ট ও রিনিউ পাসপোর্টের ফি একই। ফি কাঠামো নিম্নরূপ:
| মেয়াদ | পৃষ্ঠাসংখ্যা | ফি (টাকা) |
| ৫ বছর | ৪৮ পৃষ্ঠা | ৪,০২৫ |
| ৫ বছর | ৬৪ পৃষ্ঠা | ৬,৩২৫ |
| ১০ বছর | ৪৮ পৃষ্ঠা | ৫,৭৫০ |
| ১০ বছর | ৬৪ পৃষ্ঠা | ৮,০৫০ |
ফি পরিশোধ পদ্ধতি: নির্ধারিত ব্যাংকে গিয়ে চালান (Pay Order) বা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে ফি জমা দিতে হবে।
পাসপোর্ট রিনিউ হতে কত সময় লাগে?
একটি নতুন পাসপোর্টের তুলনায় রিনিউ পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণে তুলনামূলকভাবে সময় কম লাগে। কারণ এতে পুলিশ ভেরিফিকেশনের (ক্ষেত্রবিশেষে বাদ) মতো ধাপ থাকে না। সাধারণত ১৪ থেকে ২১ কার্যদিবসের মধ্যে পাসপোর্ট রিনিউ হয়ে যায়। তবে এই সময় কিছুটা নির্ভর করে আপনি সাধ্যানুযায়ী নাকি জরুরি সেবার ফি প্রদান করেছেন তার উপর।
পাসপোর্ট রিনিউ করার ক্ষেত্রে সাধারণ ভুলসমূহ
আমাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা পার্সপোর্ট নবায়ন অর্থাৎ রিনিউ করার সময় বেশ কিছু ভুল করে থাকেন। এ সকল ভুল যদি আগে থেকে জানা থাকে তাহলে এই ভুল হওয়ার কোন সম্ভবনা আর থাকেনা। যে সকল ভুল সাধারণত হয়ে থাকে:
- ভুল তথ্য প্রদান: আবেদন ফর্মে জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে না মিলে এমন তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
- অসম্পূর্ণ ডকুমেন্ট: প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র না জমা দিলে আবেদন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে।
- অনলাইন প্রক্রিয়া না বোঝা: অনলাইন আবেদন পদ্ধতি না বুঝে ভুলভাবে আবেদন করা। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ কারো সহায়তা নিন।
- দালালের ফাঁদে পড়া: দ্রুত প্রসেসিংয়ের লোভে দালালদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা থেকে বিরত থাকুন। সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত কোনো টাকা দেবেন না।
- ফি পরিশোধে ভুল: ভুল পৃষ্ঠাসংখ্যা বা মেয়াদের জন্য ফি পরিশোধ করলে সমস্যা হবে। সঠিক ফি পরিশোধ করে রসিদ সংযুক্ত করতে ভুলবেন না।
শেষ কথা
প্রত্যাশা করি আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আজ আমরা আপনাকে “ পার্সপোর্ট রিনিউ করার নিয়ম” সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পেরেছি। বর্তমানে পার্সপোর্ট রিনিউ করতে কোন প্রকার দালালের প্রয়োজন হয় না। তাই আপনি কেবলমাএ সরকারি ফি প্রদান করে পার্সপোর্ট রিনিউ করুন৷ আসুন আমরা নিজে সচেতন হই ও অন্যাকে সচেতন করি।



