অন্যান্য

প্রশিকা এনজিও লোন পদ্ধতি ২০২৬

ব্যবসা শুরু করতে চান, কৃষিকাজের উন্নতি ঘটাতে চান, নাকি বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখছেন? কিন্তু আর্থিক সংকট কি আপনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? প্রচলিত ব্যাংক ঋণের জটিল প্রক্রিয়া যদি আপনার জন্য অসুবিধাজনক হয়, তাহলে প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র (Proshika) হতে পারে আপনার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য সহায়ক প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশের গ্রামীণ ও তৃণমূল পর্যায়ে সুপরিচিত এই সংস্থাটি দশকের পর দশক ধরে কাজ করছে। এটি কেবল একটি ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি স্তম্ভ। তাদের বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে প্রশিকা এনজিও লোন একটি উল্লেখযোগ্য সেবা, যা অসংখ্য মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে।

এই নিবন্ধে আমরা প্রশিকা এনজিও লোন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব – এটির ধরন, বৈশিষ্ট্য, আবেদনের যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদন পদ্ধতি, সুদের হার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

প্রশিকা এনজিও: একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নেওয়ার আগে তার ইতিহাস ও লক্ষ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রশিকা (প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ও কাজ) বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। এর প্রধান লক্ষ্য হলো দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা, তাদের সংগঠিত করা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে একটি আত্মনির্ভরশীল সমাজ গড়ে তোলা।

প্রশিকার কাজ শুধু ক্ষুদ্রঋণ প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো বহুমুখী ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে।

প্রশিকা এনজিও লোন আসলে কী?

প্রশিকা এনজিও লোন হলো সংস্থাটির একটি সমন্বিত আর্থিক সেবা, যা বিশেষভাবে দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগণের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। এটি শুধু টাকা ধার দেওয়া নয়, বরং জীবনমান উন্নয়ন ও টেকসই আয় রোজগারের একটি উপায়।

যেখানে প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া অনেকের জন্যই কঠিন, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য, সেখানে প্রশিকা সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। এই ঋণের মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা, কৃষি পদ্ধতি আধুনিকীকরণ করা এবং পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনা।

এই লোনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো কী?

  • উদ্দেশ্যভিত্তিক ঋণ: ব্যবসা, কৃষি, শিক্ষা, বিদেশ গমনসহ বিভিন্ন খাতের জন্য আলাদা ঋণ সুবিধা।

  • সহজ শর্তাবলী: ব্যাংকের মতো জটিল কাগজপত্র বা দীর্ঘ প্রক্রিয়া সাধারণত প্রয়োজন হয় না।

  • প্রতিযোগিতামূলক হার: ঋণের সার্ভিস চার্জ বা সুদের হার মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (MRA) এর নীতিমালা অনুসরণ করে নির্ধারিত হয়।

  • নমনীয় মেয়াদ: ঋণের ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী পরিশোধের সুবিধা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪৫টি কিস্তিতে পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে।

  • নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব: নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী হওয়ায় নারী আবেদনকারীদের বিশেষ বিবেচনা করা হয়।

  • প্রশিক্ষণের সুযোগ: শুধু ঋণ নয়, ঋণগ্রহীতাকে ব্যবসা পরিচালনা, আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

প্রশিকা এনজিও থেকে কী কী ধরনের লোন পাওয়া যায়?

  • ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ: নতুন ব্যবসা শুরু বা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য (যেমন: দোকান, সেলাই কার্যক্রম, হস্তশিল্প, পোল্ট্রি ফার্ম)।

  • কৃষি ও মৎস্যচাষ ঋণ: ফসল উৎপাদন, মৎস্য চাষ বা পশুপালনের জন্য মূলধন হিসেবে (বীজ, সার, যন্ত্রপাতি ক্রয় ইত্যাদি)।

  • জীবনমান উন্নয়ন ঋণ: বাড়ি নির্মাণ/মেরামত, স্যানিটেশন সুবিধা তৈরি বা সন্তানের শিক্ষা খরচের জন্য।

  • বৈদেশিক কর্মসংস্থান ঋণ: বৈধ উপায়ে বিদেশে কাজে যাওয়ার প্রক্রিয়াজাত খরচ (যেমন: ভিসা, এয়ারফেয়ার) মেটানোর জন্য।

ঋণ পাওয়ার জন্য কী কী যোগ্যতা লাগে?

  • বাংলাদেশী নাগরিক হতে হবে এবং বয়স ১৮ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হতে হবে।

  • সাধারণত বিবাহিত হতে হয় (কিছু ক্ষেত্রে শাখা কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় শিথিলযোগ্য)।

  • প্রশিকার কোনো স্থানীয় দল বা সমিতির সদস্য হতে হবে ও নিয়মিত সঞ্চয় করতে হবে।

  • প্রতিষ্ঠানের কার্যকরী এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।

  • পূর্বে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণখেলাপি না হওয়া।

  • ঋণের কিস্তি পরিশোধের সামর্থ্যের প্রমাণ থাকতে হবে।

  • একজন স্থানীয় জামিনদার বা গ্যারান্টর প্রয়োজন হতে পারে।

আবেদনের জন্য কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন?

  • পূরণকৃত আবেদন ফরম।

  • আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)/স্মার্ট কার্ডের ফটোকপি।

  • আবেদনকারীর সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি (২ কপি)।

  • জামিনদার/নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি।

  • আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।

প্রশিকা এনজিও লোন আবেদন প্রক্রিয়া (ধাপে ধাপে)

  1. যোগাযোগ: আপনার নিকটস্থ প্রশিকা শাখা অফিসে গিয়ে ঋণ সম্পর্কে তথ্য নিন এবং একটি স্থানীয় দলে অন্তর্ভুক্ত হন।

  2. সদস্যতা ও সঞ্চয়: দলের নিয়মিত সভায় অংশ নিন এবং নির্ধারিত সাপ্তাহিক সঞ্চয় জমা দিতে থাকুন।

  3. আবেদন জমা: কিছু সময় পর ঋণের জন্য আবেদন করুন। আবেদন ফরম পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ জমা দিন।

  4. যাচাই-বাছাই: প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আপনার বাসস্থান ও প্রস্তাবিত প্রকল্প (ব্যবসার স্থান) পরিদর্শন করবেন।

  5. অনুমোদন ও অর্থ প্রাপ্তি: সবকিছু ঠিক থাকলে ঋণ অনুমোদিত হবে এবং টাকা প্রদান করা হবে।

সাধারণ জিজ্ঞাস্য (FAQ)

প্রশ: প্রশিকা এনজিওর সুদের হার কত?
উত্তর: ঋণের ধরন ও মেয়াদের উপর ভিত্তি করে সার্ভিস চার্জ বা সুদের হার সাধারণত ১১% থেকে ২৪% এর মধ্যে হয়ে থাকে, যা MRA-এর নির্দেশিকা অনুসরণ করে। সঠিক হার জানতে সরাসরি স্থানীয় শাখায় যোগাযোগ করুন।

প্রশ: অবিবাহিত ব্যক্তিরা কি ঋণ পেতে পারেন?
উত্তর: সাধারণ নীতি বিবাহিতদের জন্য হলেও, নারী উদ্যোক্তা বা বিশেষ পারিবারিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে শাখা ব্যবস্থাপকের বিবেচনায় ঋণ প্রদান করা হতে পারে। সরাসরি আলোচনা করা উচিত।

প্রশ: প্রথমবার কত টাকা ঋণ পাওয়া যায়?
উত্তর: প্রথমবার সাধারণত একটি ছোট অঙ্ক (যেমন: ৫,০০০ টাকা) থেকে শুরু হয়। সময়মতো পরিশোধের মাধ্যমে পরবর্তীতে বড় অঙ্কের ঋণের সুযোগ তৈরি হয়।

প্রশ: ঋণ পরিশোধের মেয়াদ কতদিন?
উত্তর: ঋণের পরিমাণ ও ধরনের উপর নির্ভর করে মেয়াদ নির্ধারিত হয়। অনেক ঋণ সাপ্তাহিক কিস্তিতে প্রায় এক বছর (সর্বোচ্চ ৪৫ কিস্তি) সময়ের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ থাকে।

আরও জানতে পারেনঃ ব্র্যাক এনজিও লোন পদ্ধতি

শেষ কথা

প্রশিকা এনজিও লোন কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, এটি গ্রামীণ বাংলাদেশের মানুষদের স্বপ্ন পূরণ ও আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করার একটি কার্যকরী মাধ্যম। ঋণের পাশাপাশি প্রদত্ত প্রশিক্ষণ টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি ভালো পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের মনোভাব নিয়ে এগোলে, এই ক্ষুদ্রঋণ সেবা আপনার আর্থিক স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করতে পারে। আরও বিস্তারিত জানতে এবং সরাসরি পরামর্শের জন্য আপনার নিকটস্থ প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের শাখা অফিসে যোগাযোগ করুন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button