নতুন পাসপোর্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
নতুন পাসপোর্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা প্রক্রিয়াটি প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বাংলাদেশে পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড হলেও সঠিক কাগজপত্র ছাড়া আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে শতভাগ। এই আর্টিকেলে আপনি নতুন পাসপোর্ট ইস্যুর জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ডকুমেন্ট, ফর্ম্যাট এবং পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন যা আপনার সময় বাঁচাতে সহায়ক হবে বলে আমরা মনে করি। তাহলে দেরি কেন চলুন বিস্তারিত তথ্য ধাপে ধাপে জেনে নেওয়া যাক।
নতুন পাসপোর্ট আবেদনের কাগজপত্রের তালিকা
পাসপোর্ট আবেদনের জন্য কিছু বাধ্যতামূলক কাগজপত্র প্রয়োজন যা প্রতিটি আবেদনকারীকে জমা দিতে হবে। প্রথমত, আপনাকে পূরণ করতে হবে অনলাইন পাসপোর্ট আবেদন ফর্ম যা বাংলাদেশ সরকারের ডিপার্টমেন্ট অফ ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্টের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। এই ফর্ম সঠিকভাবে পূরণের পর প্রিন্টকৃত কপি জমা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি যা অবশ্যই পরিষ্কার এবং সমস্ত তথ্য পাঠযোগ্য হতে হবে। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট হলো জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেটের কপি যা আপনার জন্মতারিখ এবং নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে।
চতুর্থ প্রয়োজনীয় কাগজ হলো পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি যার নির্দিষ্ট স্পেসিফিকেশন রয়েছে। ছবিটির ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা হতে হবে, মুখ সম্পূর্ণরূপে দৃশ্যমান থাকবে এবং কোনো ধরনের চশমা বা হেড কভার ব্যবহার করা যাবে না (ধর্মীয় বা চিকিৎসা কারণে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র ছাড়া)। পঞ্চমত পুরাতন পাসপোর্টের কপি (যদি থাকে) জমা দিতে হবে। ষষ্ঠত আবেদন ফি জমাদানের রসিদ সংযুক্ত করতে হবে যা অনলাইন পেমেন্ট বা নির্দিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়।
বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত নথিপত্র
বিভিন্ন পেশা এবং অবস্থার জন্য অতিরিক্ত কাগজপত্রের প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি চাকুরিজীবীদের ক্ষেত্রে সরকারি চাকুরির প্রমাণপত্র এবং প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র আবশ্যক। ছাত্রদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র বা ভর্তি নিশ্চিতকরণ চিঠির প্রয়োজন হতে পারে। বিবাহিত নারীদের জন্য স্বামীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং বিবাহ নিবন্ধন সার্টিফিকেট অতিরিক্তভাবে জমা দিতে হতে পারে।
নাবালক শিশুদের পাসপোর্ট আবেদনের ক্ষেত্রে অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন এবং পিতামাতার পাসপোর্টের কপি প্রয়োজন হবে। বাবা-মা উভয়ের উপস্থিতি বা নোটারি পাবলিক দ্বারা সত্যায়িত অনুমতি পত্র জমা দিতে হবে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য কর্মস্থলের নিয়োগপত্র বা কাজের পারমিটের কপি অতিরিক্ত কাগজ হিসেবে প্রয়োজন হতে পারে।
নতুন পাসপোর্ট আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করার টিপস
সব কাগজপত্রের ফটোকপি পরিষ্কার হতে হবে যাতে সমস্ত তথ্য স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান থাকে। কোনো কাগজে অবিশ্বস্ততা বা অস্পষ্টতা থাকলে আবেদন বিলম্বিত হতে পারে। সমস্ত কাগজপত্র ইংরেজি বা বাংলায় হতে হবে। অন্য ভাষার কাগজ হলে অনুমোদিত অনুবাদকের মাধ্যমে অনুবাদ করে নিতে হবে। জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেটে নামের বানান জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে পুরোপুরি মিলতে হবে। কোনো অমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে সংশোধন করে নিতে হবে।
পাসপোর্টের ধরন (সাধারণ, কর্মকর্তা বা কূটনৈতিক) অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্রের প্রয়োজন হতে পারে। অনলাইন আবেদন ফর্ম পূরণের সময় সর্বদা সঠিক এবং যাচাইকৃত তথ্য প্রদান করতে হবে। ভুল তথ্য দেওয়া হলে পাসপোর্ট ইস্যু বিলম্বিত হতে পারে বা আবেদন বাতিল হতে পারে। সমস্ত কাগজপত্র নির্দিষ্ট ক্রমে সাজিয়ে আবেদনের সাথে সংযুক্ত করতে হবে যা প্রক্রিয়াকে গতিশীল করে।
আরও জানতে পারেনঃ পাসপোর্ট আবেদন ফরম পূরণের নিয়ম
ডিজিটাল পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়ায় কাগজপত্র জমা
বর্তমানে বাংলাদেশে পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়া অত্যাধুনিক ডিজিটাল সিস্টেমে রূপান্তরিত হয়েছে। অনলাইন আবেদন ফর্ম পূরণের পর আপনাকে একটি ইউনিক রেফারেন্স নম্বর প্রদান করা হবে। এই নম্বর ব্যবহার করে আপনি আবেদনের অবস্থা ট্র্যাক করতে পারবেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের স্ক্যান কপি অনলাইনে আপলোড করার পাশাপাশি হার্ড কপি নির্ধারিত রিসেপশনে জমা দিতে হবে।
বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ কেন্দ্রে আপনার আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিস স্ক্যান নেওয়া হবে। এই পর্যায়ে আপনার আসল কাগজপত্রগুলি যাচাই করা হবে। সর্বদা অরিজিনাল কাগজপত্র সাথে নিয়ে যান কারণ স্ক্যান বা ফটোকপি দেখানোর পরও অরিজিনাল যাচাই করার প্রয়োজন হতে পারে। আবেদন জমা দেওয়ার পর একটি রিসিপ্ট সংগ্রহ করতে ভুলবেন না যা পাসপোর্ট সংগ্রহ করার সময় প্রয়োজন হবে।
সম্ভাব্য সমস্যা এবং সমাধান
কাগজপত্রে নামের বানান হলে স্থানীয় কমিশনারের কার্যালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে নামের অমিল দূর করার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। জন্ম নিবন্ধন না থাকলে জরুরি ভিত্তিতে জন্ম নিবন্ধন করার ব্যবস্থা করতে হবে। বিদেশে জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশিদের জন্য জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
পাসপোর্ট আবেদনের সময় আবেদনকারীর ব্যক্তিগত উপস্থিতি বাধ্যতামূলক কারণ বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ প্রয়োজন। শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে যা আগেই কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। কাগজপত্র হারিয়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন করে সংগ্রহ করে নিতে হবে কারণ ফটোকপি বা স্ক্যানকপি গ্রহণযোগ্য নয়।
নতুন পাসপোর্টের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের চূড়ান্ত চেকলিস্ট
নতুন পাসপোর্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই চেকলিস্টটি ভালো ভাবে দেখে নিন। প্রথমে নিশ্চিত করুন যে আপনার অনলাইন পাসপোর্ট আবেদন ফর্ম ডাউনলোড এবং প্রিন্ট করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত জাতীয় পরিচয়পত্রের স্বচ্ছ ফটোকপি প্রস্তুত করুন। তৃতীয়ত জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেটের কপি প্রস্তুত রাখুন। চতুর্থ পাসপোর্ট সাইজের নির্ধারিত স্পেসিফিকেশনের রঙিন ছবি প্রস্তুত করুন।
পঞ্চমত পুরাতন পাসপোর্টের কপি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) সংযুক্ত করুন। ষষ্ঠত আবেদন ফি জমার রসিদ সংরক্ষণ করুন। সপ্তম পেশাভিত্তিক অতিরিক্ত কাগজপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) প্রস্তুত করুন। অষ্টম বিবাহিত নারীদের জন্য অতিরিক্ত কাগজপত্র প্রস্তুত করুন। নবম নাবালকদের জন্য প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র প্রস্তুত করুন। দশম সমস্ত কাগজপত্র সঠিক ক্রমে সাজিয়ে একটি ফাইলে সংরক্ষণ করুন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তালিকা (সংক্ষিপ্ত)
| কাগজপত্রের ধরন | প্রয়োজনীয়তা | বিশেষ নির্দেশনা |
| অনলাইন আবেদন ফর্ম | বাধ্যতামূলক | ডিপার্টমেন্ট অফ ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইট থেকে পূরণ ও প্রিন্ট |
| জাতীয় পরিচয়পত্র | বাধ্যতামূলক | স্পষ্ট ফটোকপি, মেয়াদ উত্তীর্ণ না হওয়া |
| জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট | বাধ্যতামূলক | নামের বানান আইডি কার্ডের সাথে মিলতে হবে |
| পাসপোর্ট ছবি | বাধ্যতামূলক | সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড, পাসপোর্ট সাইজ |
| পুরাতন পাসপোর্ট | প্রযোজ্য ক্ষেত্রে | পুরাতন পাসপোর্টের ফটোকপি |
| আবেদন ফি রসিদ | বাধ্যতামূলক | অনলাইন বা ব্যাংক পেমেন্ট রসিদ |
| পেশাগত কাগজপত্র | বিশেষ ক্ষেত্রে | সরকারি চাকুরিজীবী/ছাত্র/বিদেশে কর্মরত |
| বিবাহ সংক্রান্ত কাগজ | বিবাহিত নারী | বিবাহ নিবন্ধন, স্বামীর আইডি কার্ড |
| অভিভাবক সম্মতি পত্র | নাবালক | পিতামাতার আইডি ও পাসপোর্ট কপি |
আরও জানতে পারেনঃ ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট করতে কী কী লাগে?
শেষ কথা
নতুন পাসপোর্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখলে আবেদনের পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ এবং দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব। বাংলাদেশের পাসপোর্ট ইস্যু প্রক্রিয়া দিন দিন আরও উন্নত ও ব্যবহারকারীবান্ধব হচ্ছে। তবুও সঠিক কাগজপত্র এবং তথ্য প্রদান এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।



