জন্ম নিবন্ধন ফি ই পেমেন্ট করার নিয়ম
নিজের হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন ও সংশোধন ফি পরিশোধ করতে চান? তাহলে জেনে নিন জন্ম নিবন্ধন ই-পেমেন্ট করার নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।
জন্ম নিবন্ধন ফি পরিশোধের জন্য পূর্বে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কার্যালয় বা কাউন্সিলর অফিসে সরাসরি উপস্থিত হতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদে নগদ অর্থ জমা দিতে গেলে সরকারি নির্ধারিত ফি’র চেয়ে বেশি টাকা আদায় করা হত। উদাহরণস্বরূপ, জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের সরকারি ফি মাত্র ৫০ টাকা হলেও, নিবন্ধক কার্যালয়ে অনেক সময় ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হতো। এসব দুর্নীতি ও ভোগান্তি এড়াতে এখন জন্ম নিবন্ধন অনলাইন পেমেন্ট বা ই-পেমেন্ট কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
জন্ম নিবন্ধন ই-পেমেন্ট করার নিয়ম, বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায় বা ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে ফি কিভাবে দেবেন, কী কী প্রয়োজনীয়তা রয়েছে – এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো আমাদের এই আর্টিকেলে।
জন্ম নিবন্ধন ই-পেমেন্ট করবো কিভাবে?
জন্ম নিবন্ধনের ফি ই-পেমেন্ট করার জন্য প্রথমে eservices.bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে ভিজিট করে ‘ই-পেমেন্ট’ অপশনে ক্লিক করুন। পরবর্তী পৃষ্ঠায় আপনার আবেদনের ধরন, আবেদন আইডি ও জন্ম তারিখ দিয়ে, ক্যাপচা কোড পূরণ করে ‘Search’ বাটনে ক্লিক করুন। আবেদনকারীর তথ্য যাচাই করে অটোমেটেড চালান সিস্টেমে যান। পেমেন্ট মাধ্যম হিসেবে বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়, ব্যাংক একাউন্ট বা কার্ড নির্বাচন করে নির্দেশিত পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করুন।
ই-পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার পর একটি চালান বা রিসিপ্ট ফরম পাবেন। এটি ডাউনলোড বা প্রিন্ট করে সংরক্ষণ করুন এবং পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী নিবন্ধকের কার্যালয়ে জমা দিন।
জন্ম নিবন্ধন ই-পেমেন্ট করার নিয়ম ধাপে ধাপে
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় (আরজিআর) কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন (বিডিআরআইএস) এর ই-সার্ভিসেস ওয়েবসাইট থেকেই জন্ম নিবন্ধনের ই-পেমেন্ট করতে হয়। প্রথমে আপনার আবেদনের প্রকৃতি (যেমন: নতুন আবেদন বা সংশোধন), আবেদন আইডি এবং নিবন্ধনকারীর জন্ম তারিখ সংগ্রহ করুন। তারপর নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: জন্ম নিবন্ধন ই-সার্ভিসেস ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের অনলাইন পেমেন্ট করতে https://eservices.bdris.gov.bd/ লিংকে প্রবেশ করুন। ওয়েবসাইটের মূল পৃষ্ঠা থেকে ‘ই-পেমেন্ট’ অপশনটিতে ক্লিক করুন।
ধাপ ২: আবেদনের তথ্য প্রদান করুন
এই ধাপে একটি অনুসন্ধান ফর্ম পাবেন। এখানে ধারাবাহিকভাবে নিম্নলিখিত তথ্যগুলো প্রদান করুন:
- আবেদনের প্রকৃতি নির্বাচন করুন: (যেমন: জন্ম নিবন্ধন আবেদন, জন্ম তথ্য সংশোধন ইত্যাদি)।
- আবেদন আইডি: অনলাইনে আবেদন করার পর প্রাপ্ত আইডি নম্বরটি লিখুন।
- জন্ম তারিখ: আবেদনপত্রে উল্লিখিত জন্ম তারিখ দিন-মাস-বছর (DD/MM/YYYY) ফরম্যাটে লিখুন।
- ক্যাপচা কোড: প্রদর্শিত ছবিতে থাকা সংখ্যা ও অক্ষরগুলো নির্দিষ্ট বক্সে সঠিকভাবে লিখুন।
সবশেষে ‘Search’ বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৩: আবেদনপত্রের তথ্য যাচাই করুন
‘Search’ করলে আপনার আবেদনপত্রের সংক্ষিপ্ত তথ্য দেখাবে। এখানে নিম্নলিখিত তথ্যগুলো মিলিয়ে নিন:
- নিবন্ধক কার্যালয়ের নাম ও ঠিকানা
- আবেদনকারীর নাম (বাংলা ও ইংরেজিতে)
- পিতার ও মাতার নাম (বাংলা ও ইংরেজিতে)
- আবেদনের তারিখ
- পরিশোধযোগ্য ফি’র পরিমাণ
- আবেদনকারীর মোবাইল নম্বর
তথ্য সঠিক হলে ‘Next’ বাটনে ক্লিক করুন। পরবর্তী পৃষ্ঠায় ‘Confirm’ বাটনে ক্লিক করে পেমেন্ট অপশনে যান।
আরও জনতে পারেনঃ পাসপোর্ট নাম্বার দিয়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স চেক
ধাপ ৪: ই-পেমেন্ট করার মাধ্যম নির্বাচন করুন
‘অটোমেটেড চালান সিস্টেম’ পৃষ্ঠা খুললে স্ক্রল করে নিচের দিকে যান। এখানে অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক কাউন্টারে জমার অপশন পাবেন। বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রধান ব্যাংকের তালিকা এখানে দেখতে পাবেন।
আপনি সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ/উপায়/রকেট) নির্বাচন করতে পারেন। অথবা, ‘সোনালী ব্যাংক লিমিটেড’-এর মত একটি ব্যাংক নির্বাচন করেও সেখান থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অপশন ব্যবহার করতে পারেন। আপনার সুবিধামত একটি মাধ্যম নির্বাচন করুন।
ধাপ ৫: জন্ম নিবন্ধন ফি অনলাইনে পরিশোধ করুন
পছন্দের ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং অপশনে ক্লিক করলে সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট গেটওয়ে পৃষ্ঠা চালু হবে। উদাহরণস্বরূপ, সোনালী ব্যাংক নির্বাচন করলে ‘Sonali Payment Gateway’ ওপেন হবে। সেখানে সাধারণত ব্যাংক একাউন্ট, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড এবং মোবাইল ব্যাংকিং – এই তিনটি প্রধান অপশন থাকে।
বিকাশ/নগদ/রকেটের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে: ‘Mobile Banking’ অপশনে ক্লিক করুন, তারপর আপনার সেবাটি (যেমন: bKash) নির্বাচন করুন। প্রদেয় অর্থের পরিমাণ দেখে কনফার্ম করুন। এবার ‘Pay with bKash’ বা অনুরূপ অপশনে ক্লিক করে আপনার মোবাইল নম্বর ও সিক্রেট পিন/কোড দিয়ে লেনদেন সম্পন্ন করুন।
ধাপ ৬: বিডিআরআইএস ই-পেমেন্টের চালান ফরম সংরক্ষণ করুন
পেমেন্ট সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি চালান বা রিসিপ্ট পৃষ্ঠা দেখাবে। এই চালানটি পরবর্তী কাজে প্রমাণ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃষ্ঠার উপরে বা নিচে ‘Print’ বা ‘Download’ (পিডিএফ হিসেবে) করার অপশন পাবেন। চালানটি অবশ্যই ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করুন এবং প্রিন্ট করে নিন। এই চালানটি পরে সংশ্লিষ্ট অফিসে জমা দিতে হতে পারে।
জন্ম নিবন্ধন ফি অনলাইনে জমা দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা
জন্ম নিবন্ধন ই-পেমেন্ট করার সময় কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি:
- তথ্য যাচাই: পেমেন্ট শুরুর আগে আবেদনকারীর নাম, আবেদন আইডি ও ফি’র পরিমাণ বারবার যাচাই করে নিন।
- স্থির ইন্টারনেট সংযোগ: দুর্বল বা অস্থির ইন্টারনেট সংযোগে পেমেন্ট প্রক্রিয়া বিচ্ছিন্ন হতে পারে। এর ফলে টাকা কাটলেও পেমেন্ট নিশ্চিত নাও হতে পারে এবং চালান তৈরি নাও হতে পারে। তাই স্থির ও ভালো ইন্টারনেট কানেকশন ব্যবহার করুন।
- পেমেন্ট নিশ্চিতকরণ: লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর পেমেন্ট সফল হয়েছে এমন মেসেজ এবং চালান নম্বর পেয়েছেন কিনা নিশ্চিত হন। চালানটি না পাওয়া পর্যন্ত ব্রাউজার বা ট্যাব বন্ধ করবেন না।
- স্ক্রিনশট সংরক্ষণ: ট্রানজেকশন আইডি বা সফল পেমেন্টের স্ক্রিনের স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করে রাখুন।
ই-পেমেন্ট করার সুবিধা
- দুর্নীতি হ্রাস: স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি ফি’র চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের প্রথা কমেছে।
- সুবিধা ও সময় সাশ্রয়: ঘরে বসে বা যেকোনো স্থান থেকে ২৪/৭ ফি পরিশোধ করা যায়, অফিসে গিয়ে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করতে হয় না।
- পেমেন্টের স্বচ্ছতা: অনলাইন চালানের মাধ্যমে ফি পরিশোধের একটি স্বচ্ছ রেকর্ড তৈরি হয়।
- নিরাপদ লেনদেন: অনুমোদিত পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয় বলে এটি নিরাপদ।
জন্ম নিবন্ধন ই-পেমেন্টে করতে জনসাধারণের ভোগান্তি
ই-পেমেন্ট সিস্টেম চালু হওয়ায় সুবিধার পাশাপাশি কিছু ভোগান্তিও রয়েছে:
- ডিজিটাল স্বল্পতা: দেশের অনেক মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ ও বয়স্ক ব্যক্তিরা, অনলাইন পেমেন্ট প্রক্রিয়ার সাথে পরিচিত নন, ফলে তাদের জন্য এটি চ্যালেঞ্জিং।
- ওয়েবসাইটের জটিলতা: কখনো কখনো বিডিআরআইএস ই-সার্ভিসেস ওয়েবসাইট ধীরগতি বা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, যা ব্যবহারকারীদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করে।
- প্রযুক্তিগত ত্রুটি: মাঝেমধ্যে পেমেন্ট গেটওয়েতে সমস্যা দেখা দেয়, যেমন টাকা কাটছে কিন্তু পেমেন্ট নিশ্চিত হচ্ছে না (Payment Failed কিন্তু Amount Deducted)।
- সচেতনতার অভাব: অনেকেই সঠিক নিয়ম বা ওয়েবসাইটের ঠিকানা না জেনে ভুল জায়গায় পেমেন্ট করার চেষ্টা করেন, যা প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
শেষকথা
জন্ম নিবন্ধন ই-পেমেন্ট কার্যক্রম বাংলাদেশের ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি দুর্নীতি কমিয়ে স্বচ্ছতা ও সুবিধা বাড়াতে সহায়তা করছে। প্রত্যাশা করে আজকের আর্টিকেল মাধ্যমে আজ আমরা আপনাকে “জন্ম নিবন্ধন ফি ই পেমেন্ট করার নিয়ম “সম্পর্কে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পেরেছি। আর্টিকেলটি সম্পর্ক যদি কোন প্রশ্ন থেকে থাকে তাহলে আপনি নির্দ্বিধায় কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন।



