আর্টস এর সাবজেক্ট কি কি
আর্টস এর সাবজেক্ট কি কি ? এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মনের একটি সাধারণ জিজ্ঞাসা। উচ্চ মাধ্যমিক থেকে শুরু করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত আর্টস বা কলা বিভাগে পড়াশোনার সুযোগ ব্যাপক । এই ধারা কেবল বইয়ের জ্ঞান নয়, বরং সমাজ, সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধ ও বিশ্লেষণী চিন্তার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। এই পোস্টে আমরা উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি ও ইন্টার), স্নাতক (অনার্স) সহ সকল স্তরে আর্টস বিভাগের সম্ভাব্য বিষয়সমূহ নিয়ে একটি গভীর ও তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা করব যা আপনার ক্যারিয়ার পছন্দকে আরও স্পষ্ট করতে সহায়তা করবে।
আর্টস বিভাগের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব
কলা বিভাগ মানবিকতা, সামাজিক বিজ্ঞান ও শিল্পকলার এক সমন্বিত রূপ। এটি শিক্ষার্থীদেরকে সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান ও সংস্কৃতির জটিল দিকগুলো বুঝতে সাহায্য করে। বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, গবেষণা দক্ষতা ও কার্যকর যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা উন্নত করাই এই বিভাগের প্রধান লক্ষ্য। বর্তমান বিশ্বে এই দক্ষতাগুলো চাকরির বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এইচএসসি (HSC) আর্টস এর সাবজেক্ট কি কি?
উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি আর্টস প্রোগ্রামটি সাধারণত দুই বছর মেয়াদী হয় এবং এতে কিছু বাধ্যতামূলক ও কিছু ঐচ্ছিক বিষয় থাকে। বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রধান বিষয়গুলোর তালিকা নিম্নরূপ:
বাধ্যতামূলক বিষয়সমূহ
১. বাংলা: ভাষা, সাহিত্য ও ব্যাকরণের গভীর পাঠ।
২. ইংরেজি: দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজির উপর দক্ষতা বৃদ্ধি।
৩. ইতিহাস: বাংলাদেশ ও বিশ্ব ইতিহাসের ক্রমবিকাশ।
৪. সমাজবিজ্ঞান: সামাজিক কাঠামো, প্রতিষ্ঠান ও পরিবর্তন সম্পর্কিত অধ্যয়ন।
জনপ্রিয় ঐচ্ছিক বিষয় (যেকোনো কয়েকটি নির্বাচন করা যায়)
৫. রাষ্ট্রবিজ্ঞান: সরকার, রাজনীতি ও রাজনৈতিক তত্ত্ব।
৬. দর্শন: তত্ত্বীয় দর্শন, নীতিবিদ্যা ও যুক্তিবিদ্যা।
৭. অর্থনীতি: মৌলিক অর্থনৈতিক নীতি, বাজার ও উন্নয়ন।
৮. ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (অথবা হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম ইত্যাদি)।
৯. মনোবিজ্ঞান: মানব আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া।
১০. ভূগোল: প্রাকৃতিক ও মানব ভূগোল।
১১. যুক্তিবিদ্যা: সঠিক যুক্তি ও চিন্তার পদ্ধতি শেখা।
১২. সংগীত (ঐচ্ছিক): সঙ্গীতের তত্ত্ব ও ব্যবহারিক দিক।
১৩. চারুকলা (ঐচ্ছিক): চিত্রকলা, অঙ্কন ও ডিজাইনের মৌলিক বিষয়।
১৪. সমাজকর্ম: সামাজিক সমস্যা ও সমাধান কৌশল।
এছাড়াও কিছু কলেজে পরিসংখ্যান, কৃষিশাস্ত্র, গৃহব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ও পাওয়া যায়। বিষয় নির্বাচনের সময় শিক্ষার্থীদেরকে তাদের আগ্রহ, শক্তি এবং ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা বা পেশার পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চ মাধ্যমিক) আর্টস এর সাবজেক্ট কি কি?
ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ে আর্টসের বিষয়গুলো এইচএসসির সাথে প্রায় একই রকম হলেও কিছু বোর্ড বা প্রতিষ্ঠানে পার্থক্য হতে পারে। সাধারণ কাঠামোটি নিম্নরূপ:
বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাধ্যতামূলক থাকে। এর সাথে শিক্ষার্থীরা সাধারণত রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, যুক্তিবিদ্যা, ভূগোল এবং মনোবিজ্ঞান – এই তালিকা থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক বিষয় নির্বাচন করে। কিছু প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, নাট্যকলা বা ফাইন আর্টস-এর মতো বিশেষায়িত ঐচ্ছিক বিষয়ও পড়ার সুযোগ রয়েছে। বিষয় কম্বিনেশনের উপর ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের পথ অনেকাংশে নির্ভর করে, তাই সতর্কতার সাথে পছন্দ করা জরুরি।
স্নাতক (অনার্স) আর্টস এর সাবজেক্ট কি কি?
অনার্স পর্যায়ে আর্টসের বিষয়ের পরিধি আরও ব্যাপক ও গভীর হয়। শিক্ষার্থীরা এখানে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার সুযোগ পান। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রদত্ত কিছু প্রধান অনার্স প্রোগ্রামের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
ভাষা ও সাহিত্য ভিত্তিক বিষয়
বাংলা
ইংরেজি
আরবি
ফারসি
সংস্কৃত
পালি
সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিষয়
ইতিহাস
দর্শন
রাষ্ট্রবিজ্ঞান
সমাজবিজ্ঞান
অর্থনীতি (বিএ বা বিএসএস উভয় প্রোগ্রামেই)
মনোবিজ্ঞান
ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
লোকপ্রশাসন
সমাজকর্ম
নৃবিজ্ঞান
শিল্প ও সংস্কৃতি ভিত্তিক বিষয়
চারুকলা (ফাইন আর্টস)
সংগীত
নাট্যকলা ও পরিবেশনা অধ্যয়ন
ফোকলোর অধ্যয়ন
পেশাভিত্তিক ও আধুনিক বিষয়
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা
আইন (এলএলবি প্রোগ্রামের পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠানে বিএ ইন ল)
ধর্মীয় শিক্ষা
সংস্কৃতি অধ্যয়ন
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
মানব সম্পদ উন্নয়ন
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কারিকুলাম এবং নির্দিষ্ট বিষয় অফার করার নীতিমালা রয়েছে। তাই, ভর্তির আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা আবশ্যক। অনেক প্রোগ্রামে বাধ্যতামূলিকভাবে নৈতিকতা, আইসিটি বা সাধারণ শিক্ষা কোর্সও যুক্ত থাকে।
আর্টসের বিষয় নির্বাচনে করণীয়
১. আগ্রহ ও দক্ষতা চিহ্নিত করুন: আপনি কোন বিষয়ে পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বা কোনটার প্রতি আপনার প্রকৃত কৌতূহল আছে?
২. ক্যারিয়ার লক্ষ্য বিবেচনা করুন: আপনি কি সিভিল সার্ভিস, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, গবেষণা, নাগরিক সমাজ, অথবা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে যেতে চান?
৩. উচ্চশিক্ষার সুযোগ খুঁজে দেখুন: আপনার পছন্দের বিষয় দিয়ে পরবর্তীতে মাস্টার্স বা পিএইচডি করার সুযোগ কেমন?
৪. বিষয়ের ব্যবহারিকতা যাচাই করুন: বর্তমান জব মার্কেটে এই বিষয়ের চাহিদা ও প্রয়োগ কোন ক্ষেত্রে হতে পারে?
৫. শিক্ষক ও পরামর্শদাতাদের সাথে আলোচনা করুন: অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে মতামত নিন।
আর্টস গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ক্যারিয়ার সম্ভাবনা
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, আর্টস পড়ে ক্যারিয়ারের সুযোগ সীমিত। বাস্তবে, এই বিভাগ থেকে অর্জিত বিশ্লেষণী ও যোগাযোগ দক্ষতা ব্যাংকিং, এনজিও, মিডিয়া, প্রকাশনা, সরকারি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মানবসম্পদ বিভাগ, বিপণন এবং শিল্প-সংস্কৃতি খাতসহ নানা ক্ষেত্রে চাহিদার সম্পদ। অনেকেই বিসিএস ক্যাডার, শিক্ষক, লেখক, সম্পাদক, পরামর্শক, মানবাধিকার কর্মী বা সাংস্কৃতিক প্রশাসক হিসেবে সফল ক্যারিয়ার গড়ে তুলছেন।
শেষ কথা
আর্টস এর সাবজেক্ট কি কি – এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, অপশন অনেক এবং প্রতিটিই একটি আলাদা জগতের দরজা খুলে দেয়। বিষয় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা আপনার শিক্ষাজীবন ও পেশাকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করে। তাই তথ্য সংগ্রহ করুন, গাইডেন্স নিন এবং সেই বিষয়টি বেছে নিন যা আপনার প্রতিভা ও উচ্চাশাকে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করতে সাহায্য করবে। আপনার শিক্ষার এই যাত্রা শুভ ও সফল হোক।
আরও জানতে পারেনঃ পাসপোর্ট আবেদন ফরম পূরণের নিয়ম



