Passport

পাসপোর্ট করতে লাগবে না পুলিশ ভেরিফিকেশন

বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য পাসপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়ার একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সংস্কার সাধন হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন থেকে নতুন পাসপোর্টের আবেদনে বাধ্যতামূলক পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্ম নিবন্ধন সনদের তথ্যের ভিত্তিতে সরাসরি পাসপোর্ট ইস্যু করা হবে। এই সংস্কার পাসপোর্ট সেবাকে দ্রুত, সহজ ও দুর্নীতিমুক্ত করার পাশাপাশি নাগরিক অধিকারকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন প্রধান উপদেষ্টার সিদ্ধান্ত

এই গুরুত্বপূর্ণ নীতি সংস্কারকে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগ থেকে প্রেরিত এ-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ প্রস্তাব তিনি সোমবার অনুমোদন করেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনুমোদনের কথা নিশ্চিত করেছে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ার অবসান ঘটছে।

পাসপোর্ট করতে লাগবে না পুলিশ ভেরিফিকেশন
পাসপোর্ট করতে লাগবে না পুলিশ ভেরিফিকেশন

এর আগে, গত রোববার জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই দিকনির্দেশনাটির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “পাসপোর্ট পাওয়া নাগরিক অধিকার।” এই মৌলিক চিন্তাধারার আলোকেই পুরোনো বিধিনিষেধ সরিয়ে ফেলে সেবাকে নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এই যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

নতুন পদ্ধতি কীভাবে কাজ করবে?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শিগগিরই একটি বিস্তারিত পরিপত্র জারি করবে, যেখানে নতুন পদ্ধতির কার্যবিধি স্পষ্ট করা হবে। মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নতুন ব্যবস্থায় নিম্নলিখিত ক্যাটাগরিগুলোতে পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট প্রদান করা হবে:

১. নতুন বা ফ্রেশ পাসপোর্টের আবেদন: কোনো বাংলাদেশি নাগরিক প্রথমবারের মতো পাসপোর্টের জন্য আবেদন করলে, শুধুমাত্র অনলাইনে যাচাইকৃত জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এর তথ্যের ভিত্তিতেই তার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ও পাসপোর্ট ইস্যু করা হবে। পুলিশের ক্লিয়ারেন্স নেওয়ার কোনো প্রয়োজন হবে না।

২. বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের জন্য: যারা বিদেশে বসবাস করছেন বা যারা নাবালক, তাদের জন্য অনলাইনে যাচাইকৃত জন্ম নিবন্ধন সনদের তথ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হবে। তাদের জন্যও পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন পড়বে না।

৩. পাসপোর্ট পুনঃইস্যু বা রিনিউয়াল: কারো পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে বা নতুন করে ইস্যুর প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রেও শুধুমাত্র জাতীয় পরিচয়পত্রের হালনাগাদকৃত তথ্যের মাধ্যমেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। পূর্বের পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে শিথিল হবে।

৪. আইনি দিক: এই পরিবর্তনকে আইনের আওতায় আনতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা যোগ করা হচ্ছে। পরিপত্রে উল্লেখ থাকবে পাসপোর্ট আবেদনকারীর তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্র ডাটাবেজ বা জন্ম নিবন্ধন ডাটাবেজের সাথে যাচাই করার প্রক্রিয়াটিই “বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ ১৯৭৩-এর ৫(২) ধারা” অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ ডিজিটাল যাচাইকরণই এখন থেকে আইনগত তদন্তের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃত হবে।

এই সংস্কার কেন প্রয়োজন ছিল?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিশ্লেষণে এই সংস্কারের পেছনে কয়েকটি গভীর ও যৌক্তিক কারণ চিহ্নিত করা যায়:

  • জনগণের ভোগান্তি দূরীকরণ: বিদ্যমান পদ্ধতিতে পাসপোর্ট পেতে আবেদনকারীকে পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য অতিরিক্ত সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ থানা বা সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে ভেরিফিকেশন যথাসময়ে না পাওয়া বা অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাবি করার কারণে আবেদনকারীদের দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা ও হেনস্থার শিকার হতে হতো। এই সংস্কার সেই বহুপাক্ষিক ভোগান্তির মূলোৎপাটন করবে।
  • সেবার গতি ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি: সরকার ইতিমধ্যে সাধারণ পাসপোর্ট ১২ কর্মদিবসে এবং এক্সপ্রেস পাসপোর্ট মাত্র ৩ কর্মদিবসে দেওয়ার নীতিমালা চালু করেছে। কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং দেরির কারণে প্রায়শই এই সময়সীমা রক্ষা করা সম্ভব হতো না। নতুন পদ্ধতি চালু হলে পাসপোর্ট ডেলিভারির সময়সীমা আরও নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং সরকারের “দ্রুত সেবা” প্রদানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ পাবে।
  • ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারাবাহিকতা: এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের একটি যৌক্তিক পরিণতি। ইতোমধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থা একটি শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে রূপান্তরিত হয়েছে। এই ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর ভর করেই এখন পাসপোর্ট সেবাকে আরও আধুনিক, স্বয়ংক্রিয় ও নিরাপদ করা সম্ভব হচ্ছে। এটি সরকারের “একটি পরিচয়, একটি সেবা” দর্শনের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ।
  • সুবিধাবাদী চক্রের অনুপ্রবেশ রোধ: পুরোনো পদ্ধতিতে কিছু অসৎ ব্যক্তি ও চক্র পুলিশ ভেরিফিকেশন নামক ধাপটিকে কাজে লাগিয়ে আবেদনকারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ বা সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করতো বলে অভিযোগ রয়েছে। সরাসরি এনআইডি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে এই ধরনের অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে, যা সেবা খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করবে।
  • বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের জন্য সুবিধা: লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি প্রবাসীর জন্য পাসপোর্ট রিনিউ বা নবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, কারণ বিদেশ থেকে পুলিশ ভেরিফিকেশন নেওয়া প্রায়ই জটিল ও দুরূহ ছিল। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধুমাত্র জন্ম নিবন্ধন বা এনআইডি তথ্যের ভিত্তিতে তারা পাসপোর্ট সেবা পাবেন, যা প্রবাসী কল্যাণে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

কার্যকর হওয়ার সময়সীমা ও প্রত্যাশা

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, মঙ্গলবারের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক পরিপত্র জারির প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিপত্র জারির তারিখ থেকেই নতুন ব্যবস্থাটি সারাদেশে কার্যকর হবে। পাসপোর্ট অফিস, ডাকঘরসহ সকল অনলাইন ও অফলাইন আবেদন কেন্দ্রে এই নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

এই সংস্কারের মাধ্যমে সরকার একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, নাগরিক সেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। “পাসপোর্ট পাওয়া নাগরিক অধিকার” – প্রধান উপদেষ্টার এই উক্তিই এখন পাসপোর্ট সেবার নতুন মন্ত্র হয়ে উঠেছে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং নাগরিকদের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তনেরই ইঙ্গিতবাহী। আশা করা যায়, এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও শ্রমবাজার সংক্রান্ত গতিশীলতাকেও নতুন গতি দেবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সহজেই তার ভ্রমণ দলিল পেয়ে বিশ্বজগতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।

আরও জানতে পারেনঃ পাসপোর্ট নাম্বার দিয়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স চেক

শেষ কথা

পরিশেষে বলা যায় যে পাসপোর্ট করতে পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগবে না এটি বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য একটি দারুণ সুবিধা কারণ অনেক নাগরিকরা রয়েছেন যারা ভেরিফিকেশনের জন্য তাদের পার্সপোর্ট অনেক দেরিতে পান। হতাশা করি আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আজ আমরা আপনাকে বিস্তারিত তথ্য জানতে পেরেছি ‘আর্টিকেলটি সম্পর্ক যদি আপনার কোন প্রশ্ন থেকে থাকে তাহলে আপনি নির্দ্বিধায় কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন। 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button