Birth Registration

জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার নিয়ম

জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার নিয়ম জানেন জানেন কী? জন্ম নিবন্ধন বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনি ডকুমেন্ট। তবে কখনো কখনো একই ব্যক্তির একাধিক বা ডুপ্লিকেট জন্ম নিবন্ধন তৈরি হয়ে যায় অথবা জন্ম নিবন্ধনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যজ্ঞাপন ভুল থেকে যায়। এসব ক্ষেত্রে আমাদের জন্ম সনদ বাতিল করার আবেদন করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এই আর্টিকেলে আজ আমরা জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, খরচ ও পুরো পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার প্রয়োজনীয়তা

জন্ম নিবন্ধন শুধুমাত্র একটি সনদ নয় বরং এটি দেশের নাগরিকত্ব, বয়স প্রমাণ, পরিচিতি প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চাকরি প্রাপ্তি, ভোটার আইডি কার্ড ও পাসপোর্ট ইস্যু সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই ব্যক্তির একাধিক জন্ম নিবন্ধন সনদ থাকলে তা সুবিধার বদলে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। আপনার ভুল তথ্যযুক্ত জন্ম সনদ অন্য কেউ ব্যবহার করে আপনার পরিচয়ে অবৈধ কাজ করতে পারে। তাছাড়া একজন ব্যক্তির একাধিক জন্ম সনদ থাকা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয় নিবন্ধন কার্যালয়ে আবেদন করে অতিরিক্ত বা ডুপ্লিকেট জন্ম নিবন্ধন সনদ বাতিল করা যায়। নিচে আমরা জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার পূর্ণাঙ্গ নিয়ম আলোচনা করছি।

দ্রষ্টব্য: জন্ম নিবন্ধনে শুধুমাত্র তথ্যগত ভুল থাকলে (যেমন নামের বানান, জন্মতারিখ ইত্যাদি) সনদটি বাতিল না করে সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়। বর্তমানে অনলাইনে খুব সহজেই জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন করা যায় ও আবেদন সঠিক হলে অল্প সময়েই সংশোধন সম্পন্ন হয়।

জন্ম নিবন্ধন বাতিল করতে কি কি লাগে?

জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার আবেদন করতে নিচের কাগজপত্র ও তথ্যগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে:

  1. ১৭-অঙ্কের জন্ম নিবন্ধন নম্বর: যে সনদটি বাতিল করতে চান, তার অনলাইন বা ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন নম্বর।
  2. জন্ম তারিখ: জন্ম নিবন্ধন সনদে উল্লিখিত জন্ম তারিখ।
  3. একাধিক সনদের প্রমাণ: আপনার名下 সমস্ত জন্ম নিবন্ধন সনদের ফটোকপি বা আসল কপি (যদি থাকে)।
  4. আবেদন ফি: জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার জন্য নির্ধারিত ফি (বর্তমানে ১০০ টাকা)।
  5. আবেদনকারীর পরিচয়পত্র: জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্য কোনও সরকারি পরিচয়পত্র।

মনে রাখবেন: শুধুমাত্র ডুপ্লিকেট বা একাধিকবার ইস্যুকৃত অনলাইন জন্ম নিবন্ধনই বাতিলের আওতায় আসে। ২০০১ সালের পূর্বের হাতে লেখা পুরোনো সনদগুলো ইতিমধ্যে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় কর্তৃক বাতিল করা হয়েছে।

জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার নিয়ম ধাপে ধাপে

বর্তমানে জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে। তাই সরাসরি স্থানীয় পর্যায়ের কার্যালয়ে গিয়ে আবেদন করতে হবে।

আবেদনের স্থান:

  • আপনার স্থায়ী ঠিকানা অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়
  • পৌরসভা কার্যালয় (যদি পৌর এলাকায় বসবাস করেন)
  • সিটি কর্পোরেশন/কাউন্সিলর অফিস (সিটি কর্পোরেশন এলাকার জন্য)

প্রক্রিয়া:

  1. সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে “জন্ম নিবন্ধন বাতিল/সংশোধনের আবেদন ফরম” (ফরম-৮) সংগ্রহ করুন। এটি অনলাইনেও ডাউনলোড করা যেতে পারে।
  2. সঠিকভাবে ফরমটি পূরণ করুন (ফরম পূরণের নিয়ম নিচে দেওয়া হল)।
  3. ফরমের সাথে উপরে উল্লিখিত সকল কাগজপত্রের ফটোকপি ও আবেদন ফি জমা দিন।
  4. কার্যালয়ের কর্তৃপক্ষ আপনার আবেদন ও কাগজপত্র যাচাই করবেন।
  5. তারা তাদের ইউনিক ইউজার আইডি ব্যবহার করে bdris (Birth and Death Registration Information System) সার্ভার থেকে ডুপ্লিকেট এন্ট্রি খুঁজে বের করবেন এবং প্রমাণিত হলে অপ্রয়োজনীয় সনদটি বাতিল করবেন।
  6. বাতিলকৃত সনদের তথ্য নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে জানানো হবে।

জন্ম নিবন্ধন বাতিল আবেদন ফরম পূরণ করার নিয়ম

আবেদন ফরমটি (বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত, মার্চ ৮, ২০১৮ অনুসারে) নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে পূরণ করুন:

জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার নিয়ম
জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার নিয়ম
  1. শীর্ষ ঘর: আপনার ১৭ অঙ্কের জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং সনদ ইস্যুর তারিখ লিখুন।
  2. ১ নং ঘর: নিবন্ধিত ব্যক্তির পূর্ণ নাম (সনদ অনুযায়ী) লিখুন।
  3. ২ নং ঘর: নিবন্ধিত ব্যক্তির জন্ম তারিখ লিখুন।
  4. ৩ নং ঘর – সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ:
    • বিদ্যমান তথ্য: এখানে লিখুন – “একাধিক/ডুপ্লিকেট জন্ম নিবন্ধন রয়েছে”।
    • সংশোধনীর তথ্য: এখানে লিখুন – “ডুপ্লিকেট জন্ম নিবন্ধন বাতিল করতে চাই”।
    • সংশোধনের কারণ: এখানে লিখুন – “ডুপ্লিকেট জন্ম নিবন্ধন”।
  5. ৪ নং ঘর: ‘সত্য’ লিখে দিয়ে স্বাক্ষর করুন। এটি একটি ঘোষণাপত্র যে আপনি সঠিক তথ্য দিয়েছেন।
  6. ৫ নং ঘর: আপনি যে সকল কাগজপত্র সংযুক্ত করছেন তার তালিকা লিখুন (যেমন: জাতীয় আইডি, অন্যান্য জন্ম সনদের কপি ইত্যাদি)।
  7. ডানপাশের ঘর: আবেদনকারীর স্বাক্ষর, নাম, মোবাইল নম্বর এবং নিবন্ধিত ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক উল্লেখ করুন।

ফরমের বাকি অংশগুলি নিবন্ধন কর্মকর্তা পূরণ করবেন।

আরও জানতে পারেনঃ নতুন ভোটার আবেদন ফরম ডাউনলোড

জন্ম নিবন্ধন বাতিল সম্পর্কিত আইনি বিধান

“জন্ম নিবন্ধন বিধিমালা, ২০১৮”-এর পঞ্চম অধ্যায়ের ধারা-১৫ এ জন্ম নিবন্ধন সংশোধন ও বাতিলের নিয়ম বর্ণিত আছে। মূল নীতিগুলো হলো:

  • সরল বিশ্বাসে বা যৌক্তিক কারণবশত একাধিক সনদ ইস্যু হয়ে থাকলে, নিবন্ধিত ব্যক্তি বা তার আইনানুগ অভিভাবকের আবেদনে নিবন্ধক যাচাই-বাছাই করে অপ্রয়োজনীয় সনদ বাতিল করবেন।
  • ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে একাধিক সনদ নেওয়ার প্রমাণ পেলে নিবন্ধক সংশ্লিষ্ট সনদ বাতিল করতে পারবেন এবং উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিধিমালার ২১ ধারা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
  • বাতিলকৃত সনদের তথ্য কার্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করতে হবে।

জন্ম নিবন্ধন বাতিলের আবেদন ফি কত?

জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার জন্য ১০০ (একশত) টাকা ফি প্রদান করতে হয়। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসে এই ফি ২ মার্কিন ডলার নির্ধারিত রয়েছে। এই ফি বিকাশ, নগদ, রকেট বা অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমেও প্রদান করা যেতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা ও পরামর্শ

আপনি যদি বেশ কিছু সতর্কতা মেনে চলেন তাহলে বেশ উপকৃত হতে পারেন। যেমন:

  • ইচ্ছাকৃতভাবে একাধিক জন্ম নিবন্ধন করা থেকে বিরত থাকুন। এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
  • জালিয়াতি বা অসৎ উদ্দেশ্যে কারো জন্ম সনদ বাতিলের চেষ্টা করা কঠিন শাস্তির কারণ হতে পারে।
  • শুধুমাত্র ভুল তথ্যের জন্য সনদ বাতিল না করে সংশোধনের পথ বেছে নিন, যা অনেক সহজ ও দ্রুততর।
  • আবেদনের সময় সবসময় সঠিক ও আসল কাগজপত্র জমা দিন।

শেষ কথা

প্রত্যাশা করি আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আজ আমরা আপনাকে “জন্ম নিবন্ধন বাতিল করার নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পেরেছি।  উপরোক্ত নিয়মাবলী ও পদ্ধতি অনুসরণ করে আপনি আপনার অপ্রয়োজনীয় বা ডুপ্লিকেট জন্ম নিবন্ধন সনদ সফলভাবে বাতিল করতে পারবেন। কোন আইনগত জটিলতা এড়াতে সর্বদা স্থানীয় নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button